চট্টগ্রামে ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টি, ২০০৭ সালের বিপর্যয় পেছনে ফেলে রেকর্ড বৃষ্টি
মো. সেলিম উদ্দিন খাঁন
চার দিনের টানা বর্ষণ ও জোয়ারের প্রভাবে চট্টগ্রামে ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার
বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই অতিভারী বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে শহরের বহু এলাকা। ২০০৭ সালের বিপর্যয় ও রেকর্ডকেও পেছনে ফেলে সৃষ্ট এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি
হয়েছে।অনাবৃষ্টির জুন পেরিয়ে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে বৃষ্টির দাপট। সাগরে প্রথমে লঘুচাপ। পরে তা মৌসুমি নিম্নচাপে পরিণত হয়ে বৃষ্টি ঝরিয়ে যাচ্ছে তিন দিন ধরে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তা মতোই চলছে বর্ষণ। আজ মঙ্গলবারের বৃষ্টি অতীতের অনেকগুলো রেকর্ড ভেঙেছে।
মঙ্গলবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার। এত বৃষ্টির দেখা আর মেলেনি নিকট অতীতে। অনেকে মেঘভাঙা বৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করছেন এই বৃষ্টিকে।
সাধারণত একটি ছোট (৩০ বর্গ কিলোমিটার) নির্দিষ্ট এলাকায় এক ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলে তাকে মেঘভাঙা বৃষ্টি বলা হয়। আজ ভোর থেকে চট্টগ্রামে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি ছিল নিরবচ্ছিন্ন। ক্রমান্বয়ে বেড়েছে এই বৃষ্টি। সকাল ৯টায় ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার, ১২টায় ছিল ৩৮৬ দশমিক ৮ মিলিমিটার। পরে ৪০০ পার।
অতিবৃষ্টি আর দুর্ভোগের কথা এলেই মনে পড়ে ২০০৭ সালের ১১ জুনের বিভীষিকা। সেদিন চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল আর পাহাড়ধসে মারা যান ১২৭ জন। প্রায় ২০ বছর আগে ওই দিনটিতে ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছিল ৪০৮ মিলিমিটার। মূলত এই বৃষ্টিই ডেকে এনেছিল বিপর্যয়। সেই ১১ জুনকেও ছাপিয়ে গেছে আজকের ৪১২ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত।
নিকট অতীতে ২০২৩ সালের ৭ আগস্ট একদিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ায় বন্যা দেখা দিয়েছিল। তখন চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেললাইনটি সদ্য স্থাপন করা হয়েছিল। উদ্বোধনের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু বৃষ্টি ও ঢলজনিত বন্যায় বেঁকে গিয়েছিল নতুন ওই রেলপথের প্রায় তিন কিলোমিটার।
সেদিন ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছিল মাত্র ৩২২ মিলিমিটার। তাহলে আজকের মৌসুমি বৃষ্টির তুলনায় সেদিনের বৃষ্টি ছিল প্রায় ৯০ মিলিমিটার কম। তবে শুধু চট্টগ্রামে নয়, ওইদিন বৃষ্টি হয়েছিল সাতকানিয়ার পূর্বদিকের জেলা বান্দরবানেও। সেখানকার পাহাড়ের ঢলও নেমে এসেছিল উপজেলাটির ওপর।
চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের আরেক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল ২০১২ সালের ২৬ জুন, নগরের আকবরশাহ মাজার এলাকায়। মারা গিয়েছিল ২৮ জন। ওইদিন ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল ৪৬৩ মিলিমিটার। আজকের চেয়ে যা প্রায় ৫০ মিলিমিটার বেশি ছিল।
২০১৭ সালের ১৩ জুন চট্টগ্রামের পাশাপাশি রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে পাহাড়ধসে প্রায় ১৫০ জন মারা যায়। সেদিন চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত ছিল ১৭৭ মিলিমিটার
। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ছিল রাঙামাটিতে।
তবে চট্টগ্রাম আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের সর্বকালের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ২৪ ঘণ্টায় ৫১১ মিলিমিটার। ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট এটি রেকর্ড করা হয়েছিল। সে হিসেবে আজকের বৃষ্টিপাত প্রায় ১০০ মিলিমিটার কম।
চলতি মৌসুমে জুন মাসে বৃষ্টির জন্য হাহাকার চলেছে। ধরতে গেলে ছিল অনাবৃষ্টি। স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৪ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয় ওই মাসে। জুনে স্বাভাবিক বৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল ৬১৩ মিলিমিটার, হয়েছে ৩৫১। আর জুলাই মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণ সাধারণত ৬৯৪ মিলিমিটার। কিন্তু আজ একদিনের বৃষ্টিতে তা অর্ধেক পার হয়ে গেছে।
এই বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট, দোকানপাট, বাসাবাড়ি সব। নগরের কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ, বহদ্দারহাট, মৌলভিপুকুর পাড়, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, চান্দগাঁও, আগ্রাবাদ ব্যাংক কলোনি, সিডিএ আবাসিক এলাকাসহ সর্বত্র পানি থই থই করছে।
চট্টগ্রাম-হাটহাজারী রোডেও উঠেছে পানি। পাহাড়ধসে নগরের রহমাননগরে মৃত্যু হয়েছে একজনের। আহত হয়েছেন আরও দুজন। জলাবদ্ধতায় মানুষের অবর্ণনীয় কষ্টে দিন কাটছে।
এজন্য স্বল্প সময়ে অধিক বৃষ্টিপাতকে দুষলেন চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মহসিনুল হক চৌধুরী। তিনি বললেন, ‘৫ জুলাই থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত তিনদিনে চট্টগ্রামে ৫৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। ৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টি ধারণ করার মতো সক্ষমতা রেখে জলাবদ্ধতা প্রকল্পটি নকশা করা হয়। অতিবৃষ্টিতে পানি জমলেও তা এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে নেমে যাবে।’
মন্তব্য করুন