KhoborBangla24
১২ এপ্রিল ২০২৬, ৭:২১ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

রাষ্ট্রীয়বাদী দেশে বৈষম্যবাদীর ঠাঁই হতে পারে না

 

ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল:

রাষ্ট্রীয়বাদী ও বৈষম্যবাদী—এই দুটি ধারণা একই সমাজে সহাবস্থান করতে পারে কি না, সেটি আজকের সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। রাষ্ট্রীয়বাদ যেখানে সমতা, ঐক্য ও সমগ্র জাতির সম্মিলিত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, সেখানে বৈষম্যবাদ তার সম্পূর্ণ বিপরীত—এটি বিভাজন সৃষ্টি করে, মানুষকে শ্রেণিভাগে ভাগ করে এবং কিছু গোষ্ঠীকে অন্যদের চেয়ে উচ্চতর বা নিম্নতর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। ফলে এই দুই দর্শন মৌলিকভাবেই পরস্পরবিরোধী।

রাষ্ট্রীয়বাদী চিন্তাধারা মূলত একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে। এখানে নাগরিক পরিচয়ই প্রধান—ব্যক্তির ধর্ম, বর্ণ, ভাষা বা আর্থিক অবস্থান নয়। একজন নাগরিক হিসেবে তার অধিকার ও মর্যাদা সবার সমান। রাষ্ট্রীয়বাদ এমন একটি কাঠামো নির্মাণ করতে চায়, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজেকে রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে অনুভব করে এবং রাষ্ট্রও তার প্রতি সমান দায়িত্ব পালন করে। এটি এক ধরনের সামাজিক চুক্তি, যেখানে সবাই সমান মর্যাদার অধিকারী।

অন্যদিকে বৈষম্যবাদী চিন্তাধারা সমাজকে বিভক্ত করে। এটি কখনো প্রকাশ্য, কখনো অপ্রকাশ্যভাবে মানুষের মধ্যে শ্রেণি বা স্তর তৈরি করে। বৈষম্যবাদীরা বিশ্বাস করে যে কিছু মানুষ বা গোষ্ঠী অন্যদের তুলনায় বেশি সুযোগ পাওয়ার যোগ্য। এই মানসিকতা রাষ্ট্রের ভেতরে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে—যেখানে সুবিধাভোগী ও বঞ্চিতদের মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে।

রাষ্ট্রীয়বাদ ও বৈষম্যবাদের এই সংঘাত কেবল তাত্ত্বিক নয়; এটি বাস্তব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি রাষ্ট্র যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে না পারে, তবে সেখানে বৈষম্যবাদী প্রবণতা জোরদার হয়। তখন রাষ্ট্রীয়বাদ কেবল একটি আদর্শ হিসেবে থেকে যায়, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটে না।

রাষ্ট্রীয়বাদী সমাজে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত “সবার জন্য সমান সুযোগ” নিশ্চিত করা। কিন্তু বৈষম্যবাদী সমাজে লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় “কিছু মানুষের জন্য অধিক সুযোগ”। এই পার্থক্যটিই মূলত রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করে। একটি রাষ্ট্র যদি তার নীতিনির্ধারণে বৈষম্যকে স্থান দেয়, তবে সেটি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয়বাদী আদর্শ থেকে সরে গিয়ে একটি শ্রেণিনির্ভর সমাজে পরিণত হয়।

বৈষম্যবাদীরা প্রায়শই তাদের অবস্থানকে বৈধতা দেওয়ার জন্য নানা যুক্তি তুলে ধরে—কখনো দক্ষতা, কখনো ঐতিহ্য, কখনো নিরাপত্তার কথা বলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব যুক্তি অনেক সময়ই বৈষম্যকে প্রতিষ্ঠিত করার একটি কৌশল মাত্র। রাষ্ট্রীয়বাদ এই ধরনের যুক্তিকে গ্রহণ করে না, কারণ এটি বিশ্বাস করে যে প্রত্যেক নাগরিকের সমান সম্ভাবনা রয়েছে, এবং সেই সম্ভাবনা বিকাশের জন্য সমান সুযোগ দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বৈষম্য সব সময় দৃশ্যমান হয় না। অনেক সময় এটি নীতিমালার ভেতরে লুকিয়ে থাকে, আবার কখনো সামাজিক আচরণের মধ্যে প্রকাশ পায়। যেমন, একই কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন মানুষের ভিন্ন মূল্যায়ন, অথবা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি অঘোষিত পক্ষপাতিত্ব—এসবই বৈষম্যের উদাহরণ। রাষ্ট্রীয়বাদী সমাজে এই সূক্ষ্ম বৈষম্যগুলো চিহ্নিত করে দূর করা অত্যন্ত জরুরি।

রাষ্ট্রীয়বাদী ও বৈষম্যবাদীর মধ্যে পার্থক্য বোঝার জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—অন্তর্ভুক্তি বনাম বর্জন। রাষ্ট্রীয়বাদ অন্তর্ভুক্তির কথা বলে; এটি চায় সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে। আর বৈষম্যবাদ বর্জনের দিকে ধাবিত হয়; এটি কিছু মানুষকে বাইরে রেখে একটি সংকীর্ণ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে। ফলে বৈষম্যবাদী চিন্তা কখনোই একটি সুস্থ রাষ্ট্রের ভিত্তি হতে পারে না।

রাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রীয়বাদী হতে চায়, তবে তাকে বৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। এটি কেবল আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নয়, বরং বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমেও নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি দমন—এসবই বৈষম্য কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

এছাড়া রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। যদি রাজনীতি নিজেই বৈষম্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে—যেখানে ক্ষমতা কেবল একটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে—তবে রাষ্ট্রীয়বাদী আদর্শ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। একটি গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা বৈষম্য কমাতে সহায়ক হতে পারে।

সামাজিক মনোভাব পরিবর্তন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈষম্য অনেক সময় মানুষের চিন্তা-চেতনার মধ্যেই গেঁথে থাকে। তাই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে এমন ভূমিকা পালন করতে হবে, যা মানুষকে সমতার মূল্য শেখায় এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতন করে।

অতএব, রাষ্ট্রীয়বাদী ও বৈষম্যবাদী চিন্তা একই সাথে টিকে থাকতে পারে না। একটি শক্তিশালী ও টেকসই রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজন সমতা, ন্যায়বিচার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি। বৈষম্যবাদ সেই পথের সবচেয়ে বড় বাধা। তাই একটি রাষ্ট্র যদি নিজেকে সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রীয়বাদী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তবে তাকে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে—এই দেশে বৈষম্যবাদীর কোনো স্থান নেই।

শেষ কথা হলো, রাষ্ট্রীয়বাদ কোনো স্লোগান নয়; এটি একটি প্রতিশ্রুতি—যে প্রতিশ্রুতি প্রতিটি নাগরিকের প্রতি সমান দায়িত্ব পালনের। আর এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে বৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: আমেরিকান প্রবাসী রেমিট্যান্সযোদ্ধা, স্পীন ডক্টর, (প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশ সাপোর্টার্স ফোরাম)

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ফটিকছড়ি ইয়ামাহা রাইডার্স ক্লাবের উদ্যোগে বাঁশখালীতে বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ

মরহুম নুরুন্নবী ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে খানখানাবাদ ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডে উপহার সামগ্রী বিতরণ

বাঁশখালীর দুর্গত মানুষের পাশে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, সহস্রাধিক পানিবন্দি পরিবারে ত্রাণ বিতরণ

চট্টগ্রাম অঞ্চলে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ১০ পদক্ষেপ

ডিসেম্বরে দেশে ফিরে দলের নেতাদের নিয়ে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা শেখ হাসিনার

সাতকানিয়ায় সাঙ্গু,ডলু,হাঙ্গর, নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম, দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী

সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন বিএনপির সারোয়ার আলমগীর

অতিবৃষ্টি ঢল-বন্যার জলে ভাসছে বাঁশখালীর ২১২ গ্রাম

ঢল-বৃষ্টি ও পাহাড়ধসে লামা-চকরিয়ায় ৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু, প্লাবিত বিস্তীর্ণ এলাকা

বান্দরবানে টানা বৃষ্টিতে বন্যার শঙ্কা,বিপৎসীমার উপরে সাঙ্গু-মাতামুহুরীর পানি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

১০

পানির নিচে ডুবে আছে চট্টগ্রাম শহর’ জনজীবন স্থবির’ বৃষ্টি ঝরছে ৪১২ মিলিমিটার

১১

ভারী বর্ষণে লোহাগাড়ায় তলিয়ে গেছে বিভিন্ন ইউনিয়ন,বিদ্যুৎবিহীন উপজেলা-বাসী- নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

১২

চট্টগ্রামে ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টি, ২০০৭ সালের বিপর্যয় পেছনে ফেলে রেকর্ড বৃষ্টি

১৩

ফরহাদাবাদে দুর্ধর্ষ চুরির অভিযোগ; আছরের সময় বসতবাড়িতে ঢুকে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট

১৪

বাঁশখালীতে গৃহবধূর ওপর সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগ, গুরুতর আহত অবস্থায় চমেকে ভর্তি

১৫

বাঁশখালীর জলাবদ্ধতা নিরসনে জলখদর খাল পরিদর্শন করলেন ইউএনও

১৬

শহীদ লিয়াকত স্মৃতি বৃত্তি পরীক্ষা-২০২৫: দক্ষিণ জোনে ৩৫০ কৃতি শিক্ষার্থীকে বৃত্তি ও সংবর্ধনা

১৭

মেডিসিন বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ফোরাম–সিটিজির ঈদ পুনর্মিলনী ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

১৮

মিরসরাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের ১৩ দফা দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা নুরুল আমিন এমপির

১৯

ঐতিহ্যবাহী আয়োজনে নতুন গিলাফে সজ্জিত হলো পবিত্র কাবা

২০