*ত্যাগের মহিমা: কোরবানি ও দায়িত্ববোধ*
*লেখক: মোঃ মাহবুবুল আলম*
প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০, ১ ১ ও ১২ তারিখে মুসলিম উম্মাহর ঘরে ঘরে প্রতিধ্বনিত হয় ত্যাগের ডাক—কোরবানি। এটি শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং হযরত ইবরাহিম আঃ ও ইসমাইল আঃ-এর অতুলনীয় আত্মসমর্পণের স্মৃতি বহনকারী ইবাদত। আল্লাহ তাআলা বলেন,
*”আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত এবং রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া”*।
এই একটি আয়াতেই কোরবানির আসল রূহ ধরা পড়ে—বাহ্যিক কর্ম নয়, অন্তরের খুলুসিয়াত ও আল্লাহভীতিই আসল কথা।
*১. কোরবানির মর্যাদা ও সুফল*
কোরবানি সামর্থ্যবান মুসলিমের উপর সুন্নাতে মুআক্কাদা। হাদিসে এসেছে, রাসূল ﷺ মদিনায় অবস্থানকালে প্রতিবছর কোরবানি করেছেন এবং কখনো তা ত্যাগ করেননি। এর মর্যাদা এতই উচ্চ যে:
– *তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম*: পশু কোরবানির মাধ্যমে বান্দা নিজের পশুত্বকে কোরবানি করে। লোভ, কৃপণতা, অহংকারকে জবাই করে তাকওয়ার পোশাক পরিধান করে।
– *সামাজিক সংহতি*: কোরবানির গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ গরিব-মিসকিনকে দেওয়া হয়। এতে ধনী-গরিবের মাঝে দূরত্ব কমে, ঈদের আনন্দ সবার ঘরে পৌঁছায়।
– *গুনাহর কাফফারা*: হাদিসে এসেছে, কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে নেকি লেখা হয়। এটি বান্দার জন্য রহমত ও মাগফিরাতের দরজা খুলে দেয়।
– *আল্লাহর নৈকট্য লাভ*: এটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সর্বোত্তম মাধ্যমগুলোর একটি। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে বিরাট নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হয়।
*২. সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না করার কুফল*
ইসলামে ইবাদতের ক্ষেত্রে সামর্থ্য শর্ত। কিন্তু যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে, যাকাত ফরজ হয়, তার উপর কোরবানিও ওয়াজিব। ফিকহবিদগণের মতে এটি ওয়াজিবের কাছাকাছি। তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অবহেলা করে কোরবানি না করা মারাত্মক গাফলতি।
এর কুফলগুলো হলো:
– *সুন্নাতে মুআক্কাদা তরকের গুনাহ*: রাসূল ﷺ বলেছেন, *”যার সামর্থ্য আছে অথচ কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে”*। হাদিসের এই কঠোর ভাষা এর গুরুত্বই বোঝায়।
– *কৃপণতা ও দুনিয়াপ্রীতির প্রকাশ*: কোরবানি না করার পেছনে মূলত থাকে মালের মোহ। এটি অন্তরকে সংকীর্ণ করে, আল্লাহর রাস্তায় খরচের স্পৃহা নষ্ট করে দেয়।
– *বঞ্চনা ও বরকতের অভাব*: যে ব্যক্তি আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ে কৃপণতা করে, তার রিজিকে বরকত কমে যায়। আল্লাহ বলেন, *”যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই বাড়িয়ে দেব”*।
– *সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে পলায়ন*: কোরবানির গোশত গরিবের হক। তা আদায় না করা মানে সমাজের দুর্বল অংশকে বঞ্চিত করা। এতে সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।
– *আত্মিক ক্ষতি*: কোরবানি না করা মানে ত্যাগের চেতনা থেকে দূরে সরে যাওয়া। ধীরে ধীরে মানুষ স্বার্থপর হয়ে পড়ে, ইবাদতের স্বাদ হারিয়ে ফেলে।
*৩. করণীয়*
যদি আল্লাহ আপনাকে সামর্থ্য দিয়ে থাকেন, তবে এই সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। কোরবানি শুধু রেওয়াজ নয়, এটি আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্কের পরীক্ষা। সামান্য কিছু টাকার মায়া ছেড়ে দিলে যে আত্মিক প্রশান্তি ও বরকত পাওয়া যায়, তা দুনিয়ার কোনো সম্পদে নেই।
আর যদি সত্যিই সামর্থ্য না থাকে, তবে আল্লাহর কাছে কোনো জবাবদিহি নেই। কিন্তু সামর্থ্য থাকার পরও “পরে করব”, “খরচ বাঁচাই”—এই অজুহাতে পিছিয়ে থাকা মুমিনের শান নয়।
—
*উপসংহার*: কোরবানি হলো তাকওয়ার ট্রেনিং গ্রাউন্ড। এখানে যে পাস করে, সে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর জন্য ত্যাগ করতে শেখে। তাই আসুন, আমরা কোরবানিকে শুধু গোশত খাওয়ার উৎসব না বানিয়ে, নিজের নফসকে কোরবানি করার উপলক্ষ বানাই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কবুল করুন। আমিন।
মন্তব্য করুন